ঢাকা , শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যু ৪৮ বছরের বিএনপি: প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা যে নিজের পরিচয় গোপন করে অপকর্ম করে, সেই বড় গুপ্ত: জামায়াত আমির মিনি ট্রাকের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী মারাত্মক আহত দেশকে অস্থিতিশীল করতে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, সতর্ক থাকুন: প্রধানমন্ত্রী চন্দনাইশে ভূমি বিরোধ নিয়ে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন জ্বালানি সংকট কাটাতে ৫ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে তনু হত্যা: দুই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ রেকর্ডময় ইনিংসে তামিমকে ছাড়িয়ে ৩৫০ রানে ইনিংস ছাড়লেন হৃদয় জ্বালানি সংকট কাটাতে আরও এলএনজি কিনছে সরকার

হারিয়ে যাওয়া মেঠোপথ: বদলে যাওয়া গ্রামের সমাজচিত্র

এক সময় গ্রাম বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বাঁশঝাড়, পুকুরঘাট আর চণ্ডীমণ্ডপে বসে থাকা একদল প্রবীণ মানুষের আড্ডা। যেখানে কারো বিপদে পুরো গ্রাম ঝাঁপিয়ে পড়ত, আর এক বাড়ির আনন্দ হতো সবার উৎসব। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই নিবিড় গ্রাম্য সমাজ ব্যবস্থায় এখন লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, যার সাথে মিশে আছে কিছু প্রাপ্তি আর অনেকখানি হারানোর সুর।

একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন

গ্রাম্য সমাজের মূল ভিত্তি ছিল একান্নবর্তী পরিবার। বড় ভাইয়ের শাসনে আর ছোট ভাইয়ের শ্রদ্ধায় যে পরিবারগুলো টিকে থাকত, আজ তা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চাপে ভেঙে ছোট হয়ে আসছে। এখন গ্রামের বাড়ির আঙিনায় আর সারিবদ্ধ হাড়ি দেখা যায় না, বরং দেয়াল তুলে আলাদা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় যেমন আলগা হচ্ছে, তেমনি প্রবীণরা ক্রমেই একাকীত্বের দিকে ঝুঁকছেন।

তথ্যপ্রযুক্তির থাবা ও সামাজিক দূরত্ব

আগে সন্ধ্যার পর গ্রামের মোড়ে বা চায়ের দোকানে যে আড্ডা জমত, সেখানে উঠে আসত এলাকার সুবিধা-অসুবিধার কথা। এখন সেই আড্ডা দখল করেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন। ফেসবুক আর ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগতের মোহে মানুষ এখন পাশের বাড়ির খবর না রাখলেও দূরের খবরের জন্য উন্মুখ। এতে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা ও সহমর্মিতা হ্রাস পাচ্ছে। এমনকি আগে ছোটদের মধ্যে যে খেলার মাঠের সংস্কৃতি ছিল, তাও এখন হারিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন

গ্রামের সমাজ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল 'পঞ্চায়েত' বা মুরুব্বিদের শাসন। গ্রামের বিচার-আচার গ্রামেই মিটে যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেখানে ঢুকে পড়েছে দলীয় রাজনীতি। অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার প্রভাব মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা টলছে স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে।

উন্নয়ন বনাম ঐতিহ্য

উন্নয়নের জোয়ারে গ্রামের কাঁচা রাস্তা আজ পাকা হয়েছে, ঘরে ঘরে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ। জীবনযাত্রার মান বেড়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এই বিবর্তন যেন গ্রামের সেই সহজ-সরল ‘প্রাণের টান’ কেড়ে নিয়েছে। মানুষের মধ্যে এখন মেকি আভিজাত্য আর প্রতিযোগিতার মনোভাব প্রবল।

শেষ কথা

গ্রামের সমাজ ব্যবস্থা পুরোপুরি আগের মতো থাকবে—এমনটা আশা করা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তন অনিবার্য। তবে আমরা যেন আধুনিক হতে গিয়ে আমাদের শিকড় ভুলে না যাই। গ্রামের মানুষের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর সামাজিক ভ্রাতৃত্বই আমাদের প্রকৃত শক্তি। সেই শক্তিকে পুঁজি করে যদি উন্নয়নকে গ্রহণ করা যায়, তবেই আমাদের গ্রামগুলো আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীর মৃত্যু

হারিয়ে যাওয়া মেঠোপথ: বদলে যাওয়া গ্রামের সমাজচিত্র

আপডেট সময় ০১:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
এক সময় গ্রাম বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠত বাঁশঝাড়, পুকুরঘাট আর চণ্ডীমণ্ডপে বসে থাকা একদল প্রবীণ মানুষের আড্ডা। যেখানে কারো বিপদে পুরো গ্রাম ঝাঁপিয়ে পড়ত, আর এক বাড়ির আনন্দ হতো সবার উৎসব। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই নিবিড় গ্রাম্য সমাজ ব্যবস্থায় এখন লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, যার সাথে মিশে আছে কিছু প্রাপ্তি আর অনেকখানি হারানোর সুর।

একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন

গ্রাম্য সমাজের মূল ভিত্তি ছিল একান্নবর্তী পরিবার। বড় ভাইয়ের শাসনে আর ছোট ভাইয়ের শ্রদ্ধায় যে পরিবারগুলো টিকে থাকত, আজ তা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চাপে ভেঙে ছোট হয়ে আসছে। এখন গ্রামের বাড়ির আঙিনায় আর সারিবদ্ধ হাড়ি দেখা যায় না, বরং দেয়াল তুলে আলাদা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় যেমন আলগা হচ্ছে, তেমনি প্রবীণরা ক্রমেই একাকীত্বের দিকে ঝুঁকছেন।

তথ্যপ্রযুক্তির থাবা ও সামাজিক দূরত্ব

আগে সন্ধ্যার পর গ্রামের মোড়ে বা চায়ের দোকানে যে আড্ডা জমত, সেখানে উঠে আসত এলাকার সুবিধা-অসুবিধার কথা। এখন সেই আড্ডা দখল করেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন। ফেসবুক আর ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগতের মোহে মানুষ এখন পাশের বাড়ির খবর না রাখলেও দূরের খবরের জন্য উন্মুখ। এতে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা ও সহমর্মিতা হ্রাস পাচ্ছে। এমনকি আগে ছোটদের মধ্যে যে খেলার মাঠের সংস্কৃতি ছিল, তাও এখন হারিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন

গ্রামের সমাজ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল 'পঞ্চায়েত' বা মুরুব্বিদের শাসন। গ্রামের বিচার-আচার গ্রামেই মিটে যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেখানে ঢুকে পড়েছে দলীয় রাজনীতি। অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার প্রভাব মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা টলছে স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে।

উন্নয়ন বনাম ঐতিহ্য

উন্নয়নের জোয়ারে গ্রামের কাঁচা রাস্তা আজ পাকা হয়েছে, ঘরে ঘরে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ। জীবনযাত্রার মান বেড়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এই বিবর্তন যেন গ্রামের সেই সহজ-সরল ‘প্রাণের টান’ কেড়ে নিয়েছে। মানুষের মধ্যে এখন মেকি আভিজাত্য আর প্রতিযোগিতার মনোভাব প্রবল।

শেষ কথা

গ্রামের সমাজ ব্যবস্থা পুরোপুরি আগের মতো থাকবে—এমনটা আশা করা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তন অনিবার্য। তবে আমরা যেন আধুনিক হতে গিয়ে আমাদের শিকড় ভুলে না যাই। গ্রামের মানুষের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর সামাজিক ভ্রাতৃত্বই আমাদের প্রকৃত শক্তি। সেই শক্তিকে পুঁজি করে যদি উন্নয়নকে গ্রহণ করা যায়, তবেই আমাদের গ্রামগুলো আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।