পহেলা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন। ১৯৭৮ সালের এই দিনেই প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী আদর্শের ভিত্তি এবং বাংলাদেশীদের আত্মপরিচয়ের ভিত্তিকে ধারণ করা রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির। প্রতিষ্ঠার চার দশকের বেশি সময় পরেও এই দলটির ইতিহাস শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠনের উত্থান-পতনের ইতিহাস নয়, বরং বাঙালি জাতির গণতান্ত্রিক অধিকার, বাংলাদেশের রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতন্ত্র, নির্বাচন, আন্দোলন, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পদপরিবর্তনের ইতিহাস।
একটি রাজনৈতিক দলের বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার পদযাত্রার ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা জটিল হয়ে ওঠে, যেখানে থাকে সফলতা, ব্যর্থতা, ত্যাগ, সংগ্রাম, আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধিতা, পুনর্গঠনের মত হাজারো অভিজ্ঞতার গল্প। বিএনপির আটচল্লিশ বছরের যাত্রাপথে ইতিহাসে রয়েছে এমনই হাজার অধ্যায়। তাই দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু উদযাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাসে এই দলের ভূমিকা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরবর্তী সময় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ ছিল অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আরও নানান জটিলতায়। সে সময়টি ছিল রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের সময়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর দেশের ক্ষমতা কাঠামো ও রাজনৈতিক ধারায় নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। সেই সংকটপূর্ণ সময় দেশ গঠনের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর গঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যে ধারণাটি সবচেয়ে গভীরভাবে সম্পৃক্ত তা হল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদ। এ দলটি মূলত বাংলাদেশী জাতীয় পরিচয়, সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি আরোপ করে গড়ে ওঠে। পাশাপাশি গণতান্ত্রিক ভাবধারা ও বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাও বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
তবে একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সময়ের গতিময়তায় এই ভাবধারাকে হতে হয় নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। গত ৪৮ বছরে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেরও ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, যার সূত্র ধরে বিএনপির মত দীর্ঘদিন বয়সী রাজনৈতিক দলের সেই বাস্তবিক ভাবধারার সাথে সৌমার্জস্য রাখা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সেই ভাবধারার সাথে নিজেকে ক্রমাগত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক ভাবধারায় দেশনায়ক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনকল্যাণমুখী রাজনীতির এক ভিন্ন ধারায় এগিয়ে যাচ্ছেন।
ক্ষমতা ও বিরোধী রাজনীতির অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিএনপি নামক দলটির রাষ্ট্রক্ষমতার ইতিহাস শুরু হয় তারই প্রতিষ্ঠাতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বের সময় থেকে। প্রায় তিন থেকে চার বার সরকার গঠন করে। শুরুর দিকে মেজর জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালে পহেলা সেপ্টেম্বর গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং খুব অল্প সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরের বছর, ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে এবং দ্বিতীয় জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠন করে। সে সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের মাধ্যমে। তবে ১৯৮২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক পরিবর্তনশীল নতুন ভাবধারা তৈরি হয় এবং ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে ওঠে। সেই নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে এবং দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ২০ মার্চ ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে পুনরায় সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে আসা বিএনপির এক নতুন উত্থান ঘটায়।
খালেদা জিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ ছিল ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি আবার সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিজয়ী হয়। এর ফলে বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর এই মেয়াদ ছিল ১০ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত। অবশেষে দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের শাসনের পর বিএনপি আবারও জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের ফলশ্রুতিতে বর্তমানে ২০২৬ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে এবং সরকার গঠন করে, যার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে, অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ইতিহাস সাদা কিংবা কালো রঙে ব্যাখ্যা করা যায় না। এতে যেমন থাকে অর্জন, তেমনি থাকে নানা সংকট, প্রতিকূলতা ও ত্যাগ-তিতিক্ষার সংগ্রাম। এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এমন এক রাজনৈতিক দল, যেটি বারংবার জনগণের ভোটে নিজেদের উত্থান ঘটিয়েছে।
আন্দোলন, সংকট ও রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক কঠিন সময় পার করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর আওয়ামী ফ্যাসিবাদের শোষণ, রোশানল ও আক্রোশকে উপেক্ষা করে জনস্বার্থে বারংবার রাজপথে হাজির হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাঙালি জাতির অধিকার রক্ষায় ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আপসহীন এক সংগ্রামী জীবন পার করেছে। এরই মাঝে নানা হামলা, মামলা, সংকট ও নির্যাতনের পর বিএনপির কোন গঠনে ছিল এক কঠিন বাধা। যে বাধাকে উপেক্ষা করে বিএনপি নামক দলটি বারংবার নিজেকে জনসম্মুখে তুলে ধরতে হয়েছে।
কিন্তু রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো—ক্ষমতার বাইরে থাকা সবসময় রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার অর্থ নয়। অনেক সময় দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতিই একটি দলকে নতুনভাবে নিজেদের সংগঠন, নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে ভাবার সুযোগ দেয়।
বিএনপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক যাত্রাকে তাই শুধু সংকটের ইতিহাস হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে একটি পুনর্গঠনের অধ্যায়। একটি পুরোনো রাজনৈতিক দল নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় কীভাবে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রেখেছে—সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
নতুন প্রজন্ম এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
২০২৬-এর বর্তমান বাংলাদেশ আর ১৯৭৮ সালের বাংলাদেশ এক নয়। বর্তমান বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে অর্থনৈতিক কাঠামো, প্রযুক্তি, মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা এক নম্বর সংযোগ।
বর্তমান বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম স্লোগানভিত্তিক রাজনৈতিক ভাবধারায় বিশ্বাসী নয়। তারা এখন জানতে চায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কীভাবে সৃষ্টি হবে, শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে উন্নত হবে, দুর্নীতি কীভাবে কমবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাঠামো কেমন হবে, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে মোকাবেলা সম্ভব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা কী এবং কতটুকু জবাবদিহিতামূলক হবে।
আজকে তরুণ ভোটাররা শুধু স্লোগান নয়, বরং ভবিষ্যতের বাস্তবমুখী পরিকল্পনা এবং সার্বিক উন্নয়ন চায়।
এ পরিবর্তিত ভাবধারার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সামঞ্জস্যপূর্ণ, উন্নয়নের বাস্তবিক পরিকল্পনা ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করাই ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যুগের ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক ভাষা বদলেছে। তাই পুরোনো ভাবধারার রাজনৈতিক ভাষা দিয়ে নতুন রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর সেই ধারাবাহিকতা পুনর্বহাল রাখাই একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
৪৮ বছর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বাইরে
একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সাধারণত স্মরণ ও উদযাপনের উপলক্ষ। কিন্তু ৪৮ বছরের একটি রাজনৈতিক ইতিহাসকে শুধু উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার গুরুত্ব কমে যায়। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হবে আত্মমূল্যায়নের সময়। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে শুধু একটি শক্তিশালী সরকারের ওপর নয়, বরং শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, কার্যকর বিরোধী দল, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর।
উপসংহার
১৯৭৮ সাল থেকে শুরু করে আজকের বিএনপি দীর্ঘ ৪৮ বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছে। দীর্ঘ পথ চলা এই দলটির যেমন রয়েছে সার্থকতা ও অর্জনের ইতিহাস, তেমনি এই দলটি হয়েছে নানা প্রতিকূলতা, সংকট এবং আন্দোলনের সাক্ষী। তাই ৪৮ বছরের বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের বয়সের হিসাব নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় এবং একই সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
নুসরাত জাহান কিন্নরী
শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সহ ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল