একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙন
গ্রাম্য সমাজের মূল ভিত্তি ছিল একান্নবর্তী পরিবার। বড় ভাইয়ের শাসনে আর ছোট ভাইয়ের শ্রদ্ধায় যে পরিবারগুলো টিকে থাকত, আজ তা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চাপে ভেঙে ছোট হয়ে আসছে। এখন গ্রামের বাড়ির আঙিনায় আর সারিবদ্ধ হাড়ি দেখা যায় না, বরং দেয়াল তুলে আলাদা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এতে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় যেমন আলগা হচ্ছে, তেমনি প্রবীণরা ক্রমেই একাকীত্বের দিকে ঝুঁকছেন।
তথ্যপ্রযুক্তির থাবা ও সামাজিক দূরত্ব
আগে সন্ধ্যার পর গ্রামের মোড়ে বা চায়ের দোকানে যে আড্ডা জমত, সেখানে উঠে আসত এলাকার সুবিধা-অসুবিধার কথা। এখন সেই আড্ডা দখল করেছে স্মার্টফোনের স্ক্রিন। ফেসবুক আর ইউটিউবের ভার্চুয়াল জগতের মোহে মানুষ এখন পাশের বাড়ির খবর না রাখলেও দূরের খবরের জন্য উন্মুখ। এতে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক মায়া-মমতা ও সহমর্মিতা হ্রাস পাচ্ছে। এমনকি আগে ছোটদের মধ্যে যে খেলার মাঠের সংস্কৃতি ছিল, তাও এখন হারিয়ে যাচ্ছে।
রাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থায় পরিবর্তন
গ্রামের সমাজ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল 'পঞ্চায়েত' বা মুরুব্বিদের শাসন। গ্রামের বিচার-আচার গ্রামেই মিটে যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেখানে ঢুকে পড়েছে দলীয় রাজনীতি। অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার প্রভাব মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের আস্থা টলছে স্থানীয় বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে।
উন্নয়ন বনাম ঐতিহ্য
উন্নয়নের জোয়ারে গ্রামের কাঁচা রাস্তা আজ পাকা হয়েছে, ঘরে ঘরে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ। জীবনযাত্রার মান বেড়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এই বিবর্তন যেন গ্রামের সেই সহজ-সরল ‘প্রাণের টান’ কেড়ে নিয়েছে। মানুষের মধ্যে এখন মেকি আভিজাত্য আর প্রতিযোগিতার মনোভাব প্রবল।
শেষ কথা
গ্রামের সমাজ ব্যবস্থা পুরোপুরি আগের মতো থাকবে—এমনটা আশা করা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। পরিবর্তন অনিবার্য। তবে আমরা যেন আধুনিক হতে গিয়ে আমাদের শিকড় ভুলে না যাই। গ্রামের মানুষের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা, সহমর্মিতা আর সামাজিক ভ্রাতৃত্বই আমাদের প্রকৃত শক্তি। সেই শক্তিকে পুঁজি করে যদি উন্নয়নকে গ্রহণ করা যায়, তবেই আমাদের গ্রামগুলো আবার প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

আনোয়ার হোসেন আবীর 
















